‘শিবিরের গুপ্ত’ আখ্যা দিয়ে শিক্ষার্থীকে নির্যাতনের অভিযোগ ছাত্রদলের বিরুদ্ধে
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ শামসুজ্জোহা হলে এক শিক্ষার্থীকে ‘শিবিরের গুপ্ত’ আখ্যা দিয়ে মারধর ও হেনস্তার অভিযোগ উঠেছে হল শাখা ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ছাত্রদল নেতারা বলেছেন, ওই শিক্ষার্থীকে কোনো ধরনের মারধর বা হয়রানি করা হয়নি।
অভিযোগকারী শিক্ষার্থী মোহাম্মদ আসিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। তাঁর অভিযোগ, হলে আসন দেওয়ার কথা বলে হল ছাত্রদলের সভাপতি মেহেদী হাসান (ফুয়াদ) তাঁর মুঠোফোন নেন। পরে ফোনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য পাওয়ার দাবি করে তাঁকে ‘শিবিরের গুপ্ত’ আখ্যা দেওয়া হয়।
শিক্ষার্থীর অভিযোগ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে মোহাম্মদ আসিফ অভিযোগ করেন, পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে তিনি দীর্ঘদিন ধরে হলে একটি আসনের চেষ্টা করছিলেন। গণরুমে আসন পাওয়ার বিষয়ে জানতে গিয়ে তিনি হল ছাত্রদলের সভাপতির সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
আসিফের ভাষ্য অনুযায়ী, ছাত্রদলের কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার বিষয়ে রাজি হওয়ার পর তাঁকে একটি গ্রুপে যুক্ত করার কথা বলে তাঁর মুঠোফোন নেওয়া হয়। ফোন পরীক্ষা করে শিবিরের রাজনীতিতে সম্পৃক্ততার অভিযোগ তোলা হয়। পরে আরও কয়েকজন সেখানে এসে তাঁকে হুমকি দেন এবং গণরুমে নিয়ে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তাঁর আরও অভিযোগ, মুঠোফোন দিয়ে বিভিন্ন ভিডিও ধারণ করা হয় এবং তাঁর কাছ থেকে বিভিন্ন কথা বলিয়ে ও লিখিয়ে নেওয়া হয়।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ওই বক্তব্যের ভিডিও ও ছাত্রদল নেতার দেওয়া কিছু স্ক্রিনশটের সত্যতা প্রথম আলোর পক্ষ থেকে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
যা বলছে ছাত্রদল
মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন হল ছাত্রদলের সভাপতি মেহেদী হাসান। তাঁর দাবি, ওই শিক্ষার্থীকে ব্যবহার করে ছাত্রদলকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
মেহেদী হাসান বলেন, আসিফ প্রায় তিন মাস ধরে অবৈধভাবে হলে অবস্থান করছিলেন এবং তাঁর আসনটি অন্য একজনকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। থাকার সমস্যা জানালে তাঁকে হল প্রাধ্যক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছিল।
ছাত্রদল নেতার দাবি, আসিফ এর আগে ছাত্রশিবিরের ওয়েলফেয়ার ভবনে ছিলেন এবং পরে শিবিরের সভাপতির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের কিছু তথ্য পাওয়া যায়। এসব তথ্যের ভিত্তিতেই বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে বলে দাবি করেন তিনি।
শিবিরের চার দাবি
ঘটনার প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতারা প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক করেন। তাঁরা চারটি দাবি জানান—হল প্রাধ্যক্ষের পদত্যাগ, ঘটনায় জড়িত ছাত্রদল নেতাদের শাস্তি, অভিযোগকারী শিক্ষার্থীর চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং হলে আসন বণ্টনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
হল ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক হাফেজ মেহেদী হাসান দাবি করেন, ওই শিক্ষার্থীর সঙ্গে ছাত্রশিবিরের কোনো সাংগঠনিক সম্পর্ক নেই। তিনি হল সংসদের ভিপি, হল ছাত্রশিবিরের সভাপতি ও হল ছাত্রদলের সভাপতির সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।
ছাত্রদলের সংবাদ সম্মেলন
ঘটনার পর হল শাখা ছাত্রদল সংবাদ সম্মেলন করে। সেখানে শিক্ষার্থীটির ছাত্রশিবিরের রাজনীতিতে জড়িত থাকার দাবি করে বিভিন্ন স্ক্রিনশট দেখানো হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, ঘটনা জানার পর তিনি হল ছাত্রদলের সভাপতিকে কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাঁর দাবি, কোনো হয়রানি বা অপ্রীতিকর আচরণ ছাড়াই শিক্ষার্থীকে হল প্রশাসনের মাধ্যমে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
তদন্তের পর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা প্রশাসনের
শহীদ শামসুজ্জোহা হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক আল-আমিন সরকার বলেন, রাত তিনটার দিকে তিনি ঘটনাটি জানতে পারেন। পরে হলে গিয়ে সংশ্লিষ্টদের তাঁর কার্যালয়ে নিয়ে কথা বলেন। তখন শিক্ষার্থীকে মারধরের বিষয়ে তাঁকে কিছু জানানো হয়নি বলে জানান তিনি।
প্রাধ্যক্ষ আরও বলেন, শিক্ষার্থীর মুঠোফোনে ব্যক্তিগত তথ্য থাকায় এবং অন্যরা ফোনটি নেওয়ার চেষ্টা করায় সেটি তিনি নিজের কার্যালয়ে রেখে দেন। পরে ভোরের দিকে শিক্ষার্থীকে তাঁর কক্ষে পাঠানো হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক মামুনুর রশীদ বলেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। প্রকৃত ঘটনা জানতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর বক্তব্যসহ সব পক্ষের বক্তব্য প্রয়োজন। তদন্তের পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।