টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ না যাওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল সরকারের: তদন্ত কমিটি
২০২৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের অংশ না নেওয়ার ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। ২২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে বিশ্বকাপে না যাওয়ার ঘটনাপ্রবাহ, বিসিবির ভূমিকা ও ভবিষ্যতের জন্য বেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরা হলেও কার ব্যক্তিগত দায়ে বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলতে পারেনি—এ বিষয়ে সরাসরি কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি কমিটি।
তবে সংবাদ সম্মেলনে তদন্ত কমিটির সদস্যরা জানান, বাংলাদেশ দলকে বিশ্বকাপে না পাঠানোর সিদ্ধান্ত ছিল তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের। ওই সময় যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টার দায়িত্বে ছিলেন অধ্যাপক আসিফ নজরুল।
তদন্ত কমিটি যেভাবে গঠিত হয়
বাংলাদেশ বিশ্বকাপে না যাওয়ার কারণ অনুসন্ধানে বর্তমান সরকার তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটির প্রধান ছিলেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. এ কে এম ওয়ালী উল্লাহ। অন্য দুই সদস্য ছিলেন সাবেক ক্রিকেটার ও বিসিবির প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার ফয়সাল দস্তগীর।
জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে তদন্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়।
কী কারণে বিশ্বকাপে যায়নি বাংলাদেশ?
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে ভারত সফর না করার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ। বিসিবি বাংলাদেশের ম্যাচগুলো ভারত থেকে শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়েছিল। কিন্তু আইসিসি সেই দাবিতে সম্মতি না দেওয়ায় বাংলাদেশ বিশ্বকাপে অংশ নেয়নি।
তদন্তের মূল ভিত্তি ছিল যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় থেকে বিসিবির কাছে পাঠানো একটি চিঠি। সেখানে নিরাপত্তার কারণে বাংলাদেশকে ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।
‘দোষটা কার আপনারা বুঝে নেন’
তদন্ত কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার ফয়সাল দস্তগীর বলেন, আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় এমন সিদ্ধান্ত একজন ব্যক্তির নেওয়া উচিত নয়। প্রতিবেদনে সরাসরি ওই ব্যক্তির নাম উল্লেখ না থাকলেও সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, ‘একজন’ বলতে তৎকালীন ক্রীড়া উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুলকে বোঝানো হয়েছে।
তবে কমিটির প্রধান ড. এ কে এম ওয়ালী উল্লাহ বলেন, এটি সরকারের সিদ্ধান্ত ছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সরকার সিদ্ধান্ত দেওয়ার পর মন্ত্রণালয় থেকে বিসিবিকে চিঠি দেওয়া হয় এবং বিসিবি সেই সিদ্ধান্ত অনুসরণ করে।
অন্যদিকে, ব্যারিস্টার ফয়সাল বলেন, তাঁর মতে বাংলাদেশের বিশ্বকাপে যাওয়া উচিত ছিল। একপর্যায়ে তিনি বলেন, সরকারের সিদ্ধান্তের কারণেই বাংলাদেশ খেলতে যেতে পারেনি—‘দোষটা কার আপনারা বুঝে নেন।’
গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজনের বক্তব্য নেওয়া হয়নি
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের একটি সীমাবদ্ধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কমিটি তৎকালীন ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, সাবেক বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম এবং আইসিসির সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে পারেনি।
আমিনুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেও সফল হয়নি বলে জানিয়েছেন ব্যারিস্টার ফয়সাল। ফলে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পক্ষের বক্তব্য সরাসরি না নিয়েই তদন্ত শেষ করা হয়েছে।
বিসিবির কাঠামোগত দুর্বলতার কথাও প্রতিবেদনে
তদন্ত কমিটি শুধু বিশ্বকাপে না যাওয়ার ঘটনা বিশ্লেষণ করেনি; বিসিবির অভ্যন্তরীণ কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা ও কূটনৈতিক ব্যর্থতার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে।
ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতাকে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন থেকে দূরে রাখা, খেলোয়াড় ও সমর্থকদের স্বার্থ সুরক্ষায় আনুষ্ঠানিক নীতিমালা তৈরি এবং বিসিবির স্বায়ত্তশাসন আরও শক্তিশালী করার সুপারিশ করেছে কমিটি।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিসিবির ক্ষমতা ও দায়িত্ব আরও স্পষ্ট করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।