‘আমি বিচার চাই না, আপনাদের বিচার করার কোনো রেকর্ড নেই’: শিশু রামিসার বাবার বুকফাটা আর্তনাদ
“আমি বিচার চাই না, কারণ আপনারা বিচার করতে পারবেন না। আপনাদের বিচার করার কোনো রেকর্ড বা ইতিহাস নেই!”—রাজধানীর পল্লবীতে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া সাত বছরের শিশু রামিসা আক্তারের খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিষয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে এভাবেই নিজের চরম আক্ষেপ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তার বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা।
হত্যাকাণ্ডের পর আজ বুধবার সকালে ভেঙে পড়া গলায় তিনি বলেন, “আপনারা বিচার করতে পারবেন না, আর আমার নিষ্পাপ মেয়েটাও কোনোদিন আর আমার বুকে ফিরে আসবে না। এ দেশে সঠিক ও দ্রুত বিচারের কোনো নজির নেই। এই ঘটনা নিয়ে বড়জোর ১০ থেকে ১৫ দিন আলোচনা চলবে, মিডিয়ায় লেখালেখি হবে। এরপর দেশে নতুন কোনো ঘটনা ঘটবে আর আমার মেয়ের রক্তভেজা এই নির্মম ঘটনা ধামাচাপা পড়ে যাবে।”
পাশবিক নির্যাতন ঢাকতেই গলা ও হাত কেটে হত্যা
উল্লেখ্য, গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর পল্লবীর একটি ভবনের ফ্ল্যাট থেকে পুলার স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসা আক্তারের মস্তকবিহীন দেহ এবং বাথরুম থেকে তার বিচ্ছিন্ন মাথা উদ্ধার করে পুলিশ। এই লোমহর্ষক ঘটনায় মূল ঘাতক প্রতিবেশী মো. জাকির হোসেন ওরফে সোহেল রানা (৩০) এবং তার স্ত্রী স্বপ্নাকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
আরও পড়ুন : কন্যাশিশুর মৃত্যু ঘিরে আবেগঘন বার্তা আজহারির
মঙ্গলবার রাতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন নজরুল ইসলাম জানান, অভিযুক্ত ঘাতক দম্পতি মাত্র দুই মাস আগে রামিসাদের ফ্ল্যাটের উল্টো দিকের ফ্ল্যাটে ভাড়া এসেছিল। প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, শিশুটি প্রতিবেশীর বিকৃত যৌন লালসা বা ধর্ষণের শিকার হয়েছিল। ধর্ষণের পর পাশবিক নির্যাতন ও রক্তক্ষরণের বিষয়টি জানাজানি হয়ে যাওয়ার ভয়েই অবুঝ শিশুটিকে প্রথমে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। পরবর্তীতে আলামত গোপন ও মরদেহ গুম করার উদ্দেশ্যে ধারালো অস্ত্র দিয়ে রামিসার মাথা ও হাত শরীর থেকে কেটে আলাদা করে ফেলা হয়। তবে ধর্ষণের বিষয়টি ময়নাতদন্ত ও কেমিক্যাল টেস্টের রিপোর্ট আসার পর পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যাবে।
মা যখন দরজায় নক করছিলেন, ভেতরে তখন চলছিল হত্যাযজ্ঞ
পুলিশের তদন্তে আরও বেরিয়ে এসেছে এক শিউরে ওঠার মতো তথ্য। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে পাঠানোর জন্য খুঁজতে বের হন তার মা। খুঁজতে খুঁজতে পাশের ফ্ল্যাটের দরজার সামনে রামিসার জুতো দেখতে পেয়ে তিনি দরজায় বারবার নক করতে থাকেন।
ডিমএপি কর্মকর্তা জানান, ঠিক যখন মা বাইরে দাঁড়িয়ে দরজায় ধাক্কা দিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই ফ্ল্যাটের ভেতরে রামিসার ওপর এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালানো হচ্ছিল। দরজার আওয়াজ পেয়ে মূল খুনি সোহেল রানা যেন জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যেতে পারে, সেই সুযোগ করে দিতেই তার স্ত্রী স্বপ্না ভেতর থেকে দীর্ঘক্ষণ দরজা বন্ধ করে রাখেন। ঘাতক পালিয়ে যাওয়ার পর স্বপ্না দরজা খুলে বাইরে এসে স্বাভাবিক আচরণ করার চেষ্টা করেন। এ কারণে পুলিশ তাকে হত্যাকাণ্ডের সরাসরি সহযোগী হিসেবে গ্রেপ্তার করেছে এবং মূল ঘাতক সোহেল রানাকে নারায়ণগঞ্জ থেকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়।
পল্লবী থানায় এই নৃশংস ঘটনায় হত্যা মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। তবে খুনিরা গ্রেপ্তার হলেও দেশের প্রচলিত আইনি দীর্ঘসূত্রতার কারণে সন্তানহারা বাবার এই অবিশ্বাস ও আর্তনাদ পুরো সমাজ ও বিচার ব্যবস্থার দিকে এক বড় প্রশ্নচিহ্ন ছুড়ে দিয়েছে।