ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন শেষ হলেও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ছাড়তে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক ৪টি রাজনৈতিক দলকে অনবরত চাপ দিয়ে যাচ্ছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। এই দলগুলোর শীর্ষ নেতারা একই সাথে অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতেরও গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন। হেফাজতের পক্ষ থেকে তাদের স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে— জামায়াত জোট অথবা হেফাজত, যেকোনো একটিকে বেছে নিতে হবে।
তবে চাপ থাকা সত্ত্বেও জামায়াত জোট ও হেফাজত— উভয় জায়গাতেই নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে চান সংশ্লিষ্ট দলগুলোর নেতারা।
যে ৪ দলকে চাপ দেওয়া হচ্ছে
জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের শরিক দলগুলো হলো: ১. বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস (আমির মামুনুল হক, যিনি হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব) ২. খেলাফত মজলিস (আমির আবদুল বাছিত আজাদ ও মহাসচিব ড. আহমেদ আবদুল কাদের, দুজনেই হেফাজতের নায়েবে আমির) ৩. নেজামে ইসলাম পার্টি (মহাসচিব মুসা বিন ইজহার, যিনি হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব) ৪. খেলাফত আন্দোলন (আমিরে শরিয়ত হাবিবুল্লাহ মিয়াজী, যিনি হেফাজতের নায়েবে আমির)
হেফাজতের আপত্তি ও তদন্ত কমিটি
নির্বাচনের আগে জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদীর মতবাদকে ‘ভ্রান্ত’ ও জামায়াতকে ‘ইসলামবিরোধী’ আখ্যা দিয়েছিলেন হেফাজতের আমির শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী এবং মহাসচিব সাজিদুর রহমান। এমনকি জামায়াত জোটকে ভোট দেওয়া ‘হারাম’ বলে ফতোয়াও দিয়েছিলেন হেফাজত আমির।
নির্বাচনের পর এই ৪টি দলের অবস্থান পর্যালোচনার জন্য গত ২৮ এপ্রিল হেফাজতের নায়েবে আমির মাওলানা আইয়ুব বাবুনগরীর নেতৃত্বে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটিকে এক মাসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে, যার ফলে দলগুলোর নেতাদের হেফাজত থেকে বহিষ্কারের গুঞ্জনও ছড়ায়।
বিএনপির উদাহরণ টেনে নেতাদের পাল্টা যুক্তি
হেফাজতের চাপের মুখে দলগুলোর নেতারা বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ থাকা কওমি দলগুলোর উদাহরণ টানছেন। হেফাজত-সংশ্লিষ্ট জমিয়ত উলামায়ে ইসলামের দুই অংশ বিএনপির সঙ্গে জোট করে নির্বাচন করেছে এবং ইসলামী ঐক্যজোটও বিএনপির সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখছে। জমিয়তের বহু শীর্ষ নেতা বিএনপির সমর্থনে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচনও করেছেন।
জোটের শরিক দলের নেতারা প্রশ্ন তুলেছেন, "জমিয়ত বা অন্য দলগুলো যদি বিএনপির জোটে থেকে হেফাজতে থাকতে পারে, তবে আমরা জামায়াত জোটে থাকলে কেন আপত্তি তোলা হচ্ছে? অতীতেও আমরা জামায়াত ও বিএনপি—উভয়ের সাথেই একই জোটে ছিলাম।"
হেফাজত আমিরের সঙ্গে মামুনুল হকের বৈঠক
উদ্ভূত পরিস্থিতির মধ্যেই রোববার (১৭ মে) বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক চট্টগ্রামের বাবুনগর মাদ্রাসায় গিয়ে হেফাজত আমির মুহিবুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বাকি তিন দল সশরীরে না গেলেও বৈঠকে তাদের প্রতিনিধিত্ব করেন মামুনুল হক নিজেই।
বৈঠক শেষে মামুনুল হক বলেন, “বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতা ও জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে বিভিন্ন মত ও পথের দল নিয়ে ১১ দলীয় ঐক্য গঠিত হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আমাদের আকিদা ও আদর্শিক পার্থক্য আগের মতোই রয়েছে। এটি কোনো আদর্শিক ঐক্য নয়, নিছক রাজনৈতিক ঐক্য।”
বৈঠকে উপস্থিত থাকা হেফাজত ও বাংলাদেশ খেলাফতের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আতাউল্লাহ আমীন জানান, জোট না ছাড়লে হেফাজত থেকে বহিষ্কারের গুঞ্জনটি সঠিক নয়। হেফাজত অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবেই থাকবে, আর নেতারা রাজনৈতিক বাস্তবতা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবেন— এই বিষয়টি হেফাজত আমিরকে বোঝানো হয়েছে।
সংসদে বিরোধী ভূমিকা ও জোটের ভবিষ্যৎ
ইসলামী আন্দোলনের চরমোনাই পীর নির্বাচনের আগে জামায়াতের সাথে যুগপৎ আন্দোলন করলেও আসন বণ্টন নিয়ে টানাপোড়েনে জোট ভাঙেন এবং বর্তমানে হেফাজতের সুরে জামায়াতের সমালোচনা করছেন।
তবে উদ্ভূত পরিস্থিতির মধ্যেও জামায়াত, এনসিপিসহ ১১ দলীয় জোটের অবস্থান দৃঢ় রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। জোটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, তারা সম্মিলিতভাবে সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করবে এবং জুলাই সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের দাবিতে সংসদের বাইরেও আন্দোলন চালিয়ে যাবে।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং ১১ দলের সমন্বয়কারী হামিদুর রহমান আযাদ এই প্রসঙ্গে বলেন, “কোনো দলই জোট ছাড়ছে না। বরং জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য আমাদের এই জোট আরও বেশি দৃঢ় ও শক্তিশালী হচ্ছে।”
অনুরূপ সংবাদ
ইসলামী ব্যাংক নিয়ে ষড়যন্ত্র চলছে : গোলাম পরওয়ার
নাসীরুদ্দীন ইস্যুতে জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রাশেদ খাঁনের
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ‘প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড মধ্যযুগীয়’ মন্তব্যের প্রতিবাদ গোলাম পরওয়ারের