Friday, 20 March 2026

সর্বশেষ খবর:

বিশ্বের ভূমিকম্পপ্রবণ দেশগুলোর মাঝে বাংলাদেশ কতটা ঝুঁকিতে?

জাতীয় December 2, 2025 03:04 AM ১৩২ দর্শক
বিশ্বের ভূমিকম্পপ্রবণ দেশগুলোর মাঝে বাংলাদেশ কতটা ঝুঁকিতে?

ভূমিকম্প পৃথিবীর স্বাভাবিক ভূ-প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার একটি অংশ। প্রতিদিন বিশ্বজুড়ে গড়ে প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি ভূমিকম্প এবং বছরে ২০ হাজারের বেশি কম্পন রেকর্ড করা হয়। তবে সব ভূমিকম্পই দুর্যোগ ডেকে আনে না। কোনো ভূমিকম্প কতটা ক্ষতিকর হবে, তা নির্ভর করে এর মাত্রা, উৎসের গভীরতা, কম্পনের স্থায়িত্ব, ভৌগোলিক অবস্থান এবং জনবসতির ঘনত্বের ওপর।

এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠেছে—ভূমিকম্পপ্রবণ দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান আসলে কোথায়?

ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ একটি ছোট দেশ হলেও এটি অবস্থান করছে পৃথিবীর অন্যতম উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ টেকটনিক অঞ্চলের পাশে। ইন্ডিয়ান প্লেট, ইউরেশিয়ান প্লেট ও বার্মা মাইক্রোপ্লেটের সংযোগস্থলের কাছে অবস্থানের কারণে ভূমিকম্পের পরোক্ষ ঝুঁকি বাংলাদেশের জন্য স্থায়ী উদ্বেগের বিষয়। যদিও বাংলাদেশ সরাসরি ‘অত্যন্ত ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ’ হিসেবে চিহ্নিত নয়, কিন্তু পার্শ্ববর্তী ভারত ও মিয়ানমারের শক্তিশালী ভূমিকম্প নিয়মিতভাবেই দেশের বিভিন্ন স্থানে অনুভূত হয়।

বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, বাংলাদেশের ঝুঁকি বেশি মূলত ভূমিকম্পের সংখ্যা নয়, বরং এর উৎস ও অবস্থানগত জটিলতায়। তার ভাষায়, দেশে পাঁচটি পরিচিত সিসমিক সোর্স রয়েছে এবং আরও দুটি ব্লাইন্ড সোর্স চিহ্নিত হয়েছে, যাদের উৎপত্তিস্থল সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য নেই। এ কারণে মাঝারি মাত্রার কম্পনও বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে।

বিশ্বের সবচেয়ে ভূমিকম্পপ্রবণ দেশের তালিকায় রয়েছে ইন্দোনেশিয়া, জাপান, ফিলিপাইন ও নিউজিল্যান্ড। এসব দেশ প্যাসিফিক রিং অব ফায়ারের ওপর অবস্থান করায় সেখানে শক্তিশালী ভূমিকম্প প্রায় নিয়মিত ঘটনা। তবুও, সেখানে মৃত্যুহার তুলনামূলক কম। কারণ এসব দেশে ভবন নির্মাণে কঠোর সিসমিক কোড, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, নিয়মিত দুর্যোগ মহড়া এবং শক্তিশালী ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা রয়েছে।

বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক ‘ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রসপেক্টাস ২০২৫’ অনুযায়ী, জনসংখ্যার দিক থেকে ঢাকা এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। এর বর্তমান জনসংখ্যা ৩ কোটিরও বেশি, এবং পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০৫০ সালে এটি বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল শহরে পরিণত হতে পারে।

নরম মৃত্তিকা, ঘনবসতি, পরিকল্পনাবহির্ভূত নগরায়ন এবং সিসমিক কোড না মানার কারণে ঢাকার ভূমিকম্প ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। পুরান ঢাকা, চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকা এবং সিলেট অঞ্চলে ৪ থেকে ৫ মাত্রার ভূমিকম্পেও আতঙ্ক ও ক্ষয়ক্ষতির অভিজ্ঞতা রয়েছে।

এক হিসাবে দেখা গেছে, ২০০১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে অন্তত ৬০০টি ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। এর মধ্যে বছরপ্রতি গড়ে ৫ থেকে ৮টি ছিল ৪ মাত্রা বা তার বেশি। তুলনায় জাপানে বছরে লক্ষাধিক মাইক্রো ভূমিকম্প এবং ১,০০০-এর বেশি মাঝারি মাত্রার কম্পন ঘটে।

অতএব, ভূমিকম্পের সংখ্যায় বাংলাদেশ শীর্ষে না থাকলেও সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির বিচারে ঝুঁকি মাঝারি থেকে উচ্চ পর্যায়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমিকম্প সরাসরি মানুষ হত্যা করে না; বরং অপরিকল্পিত ও দুর্বল ভবন ধসেই বেশি প্রাণহানি ঘটে।

ড. আনসারীর ভাষায়, “ভূমিকম্প স্বাভাবিক প্রাকৃতিক ঘটনা, কিন্তু ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্পূর্ণ মানুষের হাতে। পরিকল্পিত নগরায়ন, মানসম্মত নির্মাণ এবং জনসচেতনতা বাড়ালে বড় বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব।”

অনুরূপ সংবাদ